ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক
এরফান হোছাইন. জেলা প্রতিনিধি (কক্সবাজার)
প্রকাশিত: সোমবার ৪ঠা ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:২১ পূর্বাহ্ন
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান

ইসলাম শান্তি ও মানবতার ধর্ম। ভিন্ন ধর্মের ব্যাপারে উদার ও সহানুভূতিশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের ও অনুসারীদের নিরাপত্তা ও অধিকার সংরক্ষণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। ইসলাম মানে শান্তি, ইমান মানে নিরাপত্তা। ইসলামের উদ্দেশ্য ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন নিরাপত্তা। ইসলামের জীবনাদর্শ বিশ্বের সব মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য। পৃথিবীর সব মানুষের ব্যক্তি জীবন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ইসলামের লক্ষ্য।


বিশ্বশান্তি ও ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য প্রয়োজন মানবাধিকার সংরক্ষণ। ইসলাম ব্যক্তি মানুষের সম্মানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সংরক্ষণ করে। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, সব মানুষ ভাই ভাই কারণ সবাই একই পিতা-মাতার সন্তান। আল্লাহতাআলা বলেন, হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো যিনি তোমাদের এক প্রাণ থেকে সৃজন করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন; এরপর তাদের উভয় থেকে বহু নর ও নারী সম্প্রসারণ করেছেন। ইসলাম ভৌগোলিক, আঞ্চলিক, নৃতাত্ত্বিক, জাতিগত প্রভেদে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সমর্থন করে না। ইসলামে কোনো প্রকার শ্রেণিবৈষম্য নেই, নেই কোনো অস্পৃশ্যতার স্থান।


ইসলাম মানুষকে জাতি ও বর্ণ দিয়ে বিচার করে না; বরং তার বিশ্বাস ও কর্মের মূল্যায়ন করে। আল্লাহতাআলা বলেন হে মানবজাতি! আমি তোমাদের এক নর ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি অতঃপর তোমাদের বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত করেছি; যাতে তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে অধিক সম্মানিত যে অধিক সতর্ক ও সংযত। ইমান বা বিশ্বাস হলো আদর্শ ও জীবনব্যবস্থার মূল ভিত্তি।


ইমান আনার ক্ষেত্রে ইসলামে বল প্রয়োগের বা জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই। মানুষের কাছে সত্য ও মিথ্যার, ন্যায় ও অন্যায়ের, হেদায়াত ও গোমরাহির বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরা ছিল নবী-রাসুলদের দায়িত্ব। ইমান আনা না-আনার বিষয়টি মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও ইচ্ছার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহতাআলা বলেছেন দীনের ব্যাপারে জোর-জবরদস্তি নেই, সত্য ভ্রান্তি থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে। যে তাগুতকে অস্বীকার করবে আর আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে সে এমন এক মজবুত হাতল ধরবে যা কখনো ভাঙার নয়। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, প্রজ্ঞাময়। (সুরা-বাকারা: ২৫৬)


ইসলাম শান্তি, মৈত্রী ও সম্প্রীতির ধর্ম। সহনশীলতা, নিরপেক্ষতা ও সহমর্মিতা এর পরম বৈশিষ্ট্য। এখানে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। আল্লাহ এক ইসলামের এই মতবাদই ইসলামকে সহিষ্ণু করেছে। মুসলমানরা এ কথা বিশ্বাস করে যে মানুষ অসম্পূর্ণতা নিয়ে জগতে এসেছে। যারা দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা করে তারা বিপথগামী ঠিক; তবু সেই এক খোদারই সৃষ্টি। তাই তারাও মুসলমানদের ভ্রাতৃস্থানীয়। তাদেরকে সৎপথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব মুসলমানদের। কিন্তু যতদিন তারা স্বেচ্ছায় মুক্তির পথ বেছে না নেবে, ততদিন সহজভাবেই তাদেরকে তাদের ইচ্ছের ওপর ছেড়ে দিতে হবে।


বিশ্বাস মানুষের অন্তরের বিষয়, কর্মে তা কখনো প্রকাশ পায় আবার কখনো প্রকাশ পায় না। বিশ্বাস গড়ে ওঠে জ্ঞানের আলোয়; বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এ জন্যই যার যার বিশ্বাস তার তার, কারও বিশ্বাস নিয়ে বিদ্রূপ, কটূক্তি বা কটাক্ষ করা ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ, গাল-মন্দ ইসলামে হারাম। আল্লাহতাআলা বলেন, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তারা ডাকে, তোমরা তাদেরকে গালমন্দ করো না, ফলে তারা গালমন্দ করবে আল্লাহকে, শত্রুতা পোষণ করে অজ্ঞতাবশত। এভাবেই আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য তাদের কর্ম শোভিত করে দিয়েছি। তারপর তাদের রবের কাছে তাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তিনি জানিয়ে দেবেন তাদেরকে, যা তারা করত। (সুরা আনআম: ১০৮)


মুসলিম বিশ্বাসে ইসলাম চূড়ান্ত ধর্ম ও জীবনবিধান হলেও ইসলামী শরিয়ত সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে ইসলাম মানুষকে অভিন্ন মানবিক অধিকার ও মর্যাদা দিয়ে থাকে। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে মানবিক মূল্যবোধ ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক আল্লাহভীরু। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু জানেন, সব খবর রাখেন। (সুরা হুজরাত: ১৩)


ইসলাম কখনোই সাম্প্রদায়িক হামলা এবং অন্য ধর্মের লোকদের প্রতি অবিচার করাকে সমর্থন করে না। সমাজ ও রাষ্ট্রকে অশান্তি, জুলুম ও বিশৃঙ্খলামুক্ত করার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে বলেই ইসলাম শান্তির ধর্ম। মানুষ যদি শান্তি পেতে চায় তাহলে তার নিজের ইচ্ছেমতো জীবনযাপন না করে আল্লাহর দেয়া বিধান মেনে চলতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করে নেয়া যে জীবনাদর্শের লক্ষ্য তারই নাম ইসলাম। জীবনের প্রতিক্ষেত্র, প্রতিস্তরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিধিনিষেধ পালন করা তার সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা এবং এ লক্ষ্যে নিজেকে বিলীন করে দেয়ার নামই ইসলাম। আল্লাহ সবাইকে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতা দান করুন।