বরিশালের শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের আউটডোর বিভাগের কিছু চিকিৎসক প্রেসক্রিপশনে নকল ওষুধ ও নিম্নমানের অ্যালার্জির সাবান লিখে দিচ্ছেন। করোনা টিকার কারণে এ ধরণের অ্যালার্জি বাড়ছে জানিয়ে চিকিৎসকরা রোগীদের এ নকল সাবান ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে বলে অভিযোগ। আর চিকিৎসকের পরামর্শে সাধারণ রোগীরা অজান্তেই এসব মানহীন পণ্য ব্যবহার করে পড়ছেন ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাকেরগঞ্জ উপজেলার কর্নকাঠী এলাকার আশ্রাব আলী ফকিরের ছেলে আক্কাস আলী ফকির দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ ব্যবসা চালাচ্ছেন। একসময় ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করলেও বর্তমানে তিনি নিজেই ব্যবসা খুলে বসেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে নকল ওষুধ ও নিম্নমানের সাবান সরবরাহ করে তিনি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। স্থানীয়দের দাবি, মাত্র কয়েক বছর আগেও তিনি কয়েক হাজার টাকার চাকরি করতেন। এখন কর্নকাঠীতে একাধিক বাড়ি করেছেন, যার বাজারমূল্য কোটি টাকার বেশি।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত আছেন খোদ হাসপাতালের আউটডোর বিভাগের তিন চিকিৎসক মানসী বোদ্ধ, ডা. ফয়সাল ও ডা. মাহামুদ। স্থানীয় সূত্র ও আক্কাসের সাবেক সহযোগী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই চিকিৎসকরা আক্কাসের সরবরাহকৃত নকল ওষুধ ও মানহীন সাবান প্রেসক্রিপশনে লিখে দিচ্ছেন। যদিও মামুন জানান, তিনি দুই বছর আগে এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।
রোগীদের বক্তব্যে বিষয়টির ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। চর্মরোগে আক্রান্ত রোগী মনু মিয়া বলেন, ডাক্তার যা লেখেন তাই ব্যবহার করি। আমরা ভালো-মন্দ বুঝি না। কিন্তু ডাক্তাররা যদি রোগীর কথা না ভেবে ওষুধ কোম্পানি বা ব্যবসায়ীর স্বার্থে প্রেসক্রিপশন লেখেন, তাহলে রোগীর জীবন তো ঝুঁকির মুখে পড়বেই।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অনৈতিক কর্মকান্ড শুধু রোগীদের শারীরিক ক্ষতি নয়, আর্থিক ক্ষতিরও কারণ হচ্ছে। নকল ওষুধে কাঙ্খিত ফল পাওয়া যায় না, বরং রোগের জটিলতা আরও বেড়ে যায়। তারা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা নষ্ট করছে এবং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ব্যবসা চালানোর অভিযোগও উঠেছে আক্কাসের বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বরিশালের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়েই তিনি প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এই ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অস্বীকার করে আক্কাস আলী ফকির বলেন, আমি নকল ঔষধ বিক্রি করি না। আমার আত্মীয়রা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে। আমাদের মধ্যে মামলা চলছে। মূলত তারা প্রতিশোধ নিতে এসব ছড়াচ্ছে উল্টো অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে বিএসটিআই-এর লোগো ব্যবহার করা মানহীন সাবান প্রসঙ্গে বরিশাল বিএসটিআই-এর উপপরিচালক আব্দুল হান্নান বলেন, আমরা তথ্য পেয়েছি। খুব শিগগিরই বাজারে অভিযান পরিচালনা করব।
শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, বিষয়টি প্রথমবার সাংবাদিকদের কাছ থেকেই শুনলাম। ভিডিও ও প্রমাণ যাচাই করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।