স্বামীর চিকিৎসা খরচ চালাতে মাছ বিক্রি করেন অন্তঃসত্ত্বা চন্দনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
এইচ.এম.এ রাতুল, জেলা প্রতিনিধি, বরিশাল।
প্রকাশিত: রবিবার ২০শে আগস্ট ২০২৩ ০৮:১০ অপরাহ্ন
স্বামীর চিকিৎসা খরচ চালাতে মাছ বিক্রি করেন অন্তঃসত্ত্বা চন্দনা

একটা সময় সু-দিন থাকলেও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি শয্যাশায়ী হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েন চন্দনা রানী হালদার। তবে মানুষের কাছে হাত পেতে নয়, কিছু একটা করে অভাব-অনটনের সংসারে হাল ধরতে চেয়েছিলেন সংগ্রামী এই নারী।

তাই অন্তঃসত্ত্বা হয়েও বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাছ বিক্রি করে সংসারের হাল ধরেছেন তিনি।


সংগ্রামী এই নারী বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রত্নপুর ইউনিয়নের হাওলা গ্ৰামের দিনমজুর বিজয় হালদারের স্ত্রী।


পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার দুলালপাড়া গ্রামের কালিপদ মণ্ডলের মেয়ে চন্দনা রানী পোশাক শ্রমিক ছিলেন। পরে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বিজয় হালদারের সঙ্গে। পরে পারিবারিকভাবে ৯ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়।


বিজয় হালদার এক সময় কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। তবে সেই কর্মে ভাটা লাগায়, পরবর্তীতে মাছ বিক্রি শুরু করেন তিনি। কখনও নির্দিষ্ট স্থানে বসে আবার কখনও বাই সাইকেলের পেছনে ঝুড়িতে মাছ নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে মাছ বিক্রি করতেন তিনি।


গত ৫ বছর আগে শারীরিক অসুস্থতার কারণে চলাচলে অক্ষম (প্যারালাইজড) হয়ে পড়েন বিজয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটাই শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। আর বিজয় হালদারের এমন অবস্থায় আর কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকায় সংসারের হাল ধরতে হয় চন্দনাকে।


স্বামীর চিকিৎসা ব্যয় ও সংসারের হাল ধরার দায়িত্ব নিতে গিয়ে গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে স্বামীর মাছ বিক্রি পেশায় নিজেকে নিযুক্ত করেন চন্দনা।


এরপর থেকে পাইকারি বাজার থেকে মাছ কিনে স্থানীয় হাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়কের পাশে খোলা আকাশের নিচে বসে বিক্রি করেন। স্কুলের সামনে বসে সব মাছ বিক্রি করতে না পারলে পরে সেগুলো নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রির চেষ্টা করেন তিনি।


এ বিষয়ে চন্দনা হালদার জানান, প্রতিদিন ভোরে বাড়ি থেকে বের হন মাছ কেনার জন্য। আর পায়ে হেঁটে চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরের গৈলা পাইকারি বাজার থেকে মাছ কিনে বিক্রি করেন। শুরুর দিকে নারী হয়ে মাছ বিক্রি করার মতো কাজটি অনেকেই ভালো ভাবে নেয়নি।


তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনুকূলে রয়েছে জানিয়ে চন্দনা বলেন, শুরুর দিকে নানান জনে নানান কথা বলতো, তবে এতে কষ্ট পাইনি। কারণ কষ্ট পেলে জীবন বাঁচবে কিভাবে? পাইকার বাজার থেকে মাছ আনা থেকে বিক্রি পর্যন্ত পায়ে হেঁটে বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। আর এতে কষ্ট হলেও মাছ বিক্রি করে যে কয় টাকা লাভ হয় তা দিয়ে বর্তমানে সংসার চালাই। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ কোনো কারণে যদি একদিন মাছ বিক্রি করতে না পারি, তাহলেই টানাপোড়ন লেগে যায় সংসারে।


তিনি বলেন, একমাত্র বসবাসের ঘরটি ছাড়া চাষাবাদের জন্য তেমন কোনো ফসলি জমিও নেই, যে চাষাবাদ করে কিংবা বর্গা দিয়ে কিছু পাব। এমন দুরবস্থায় স্বামীর চিকিৎসা কিংবা নিজেদের প্রয়োজনেও কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি।


চন্দনার স্বামী দিনমজুর বিজয় হালদার জানান, পাঁচ বছরের একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে তাদের। দাম্পত্য জীবন সুখের কাটলেও হঠাৎ করে পাঁচ বছর আগে অসুস্থ হয়ে পরলে তাদের সংসারে অন্ধকার নেমে আসে।


গৈলা মাছ বাজারের পাইকারি আড়ৎদার মহাদেব মণ্ডল জানান, চন্দনা বর্তমানে প্রায় আটমাসের অন্তঃসত্ত্বা। তার স্বামী আগে মাছের ব্যবসা করতেন। সে এখন অসুস্থ হয়ে বিছানায়। কিন্তু চন্দনা সংসারের হাল ধরতে অন্তঃসত্ত্বা হয়েও মাছ কিনতে প্রতিদিন পায়ে হেঁটে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাজারে আসে। আবার কেনা মাছ নিয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে বিক্রি করছে। যার লাভের টাকায় তাদের সংসার চলছে।


এদিকে বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় রত্নপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা সরদার জানান, ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সরকারের যে ধরনের সহযোগিতা সম্ভব, তা চন্দনার পরিবারকে দেওয়া হবে। এছাড়া পরিষদের মাধ্যমে এই অসহায় পরিবারটির জন্য প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল ও মাতৃতকালীন ভাতার কার্ড করে দেয়ার কথাও জানান তিনি।


এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, মাছ বিক্রেতা চন্দনা হালদারের পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। ইতোমধ্যে সমাজকল্যাণ পরিষদের মাধ্যমে তাকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা হয়েছে।


উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সুশান্ত বালা বলেন, বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে চন্দনা রানী হালদারকে আর্থিক সহায়তা করা হয়েছে। আর তার স্বামীকে শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। শীঘ্রই সেই ভাতার টাকাও তিনি মোবাইলের মাধ্যমে পেয়ে যাবেন। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের সরকারি সহায়তার আওতায় পরিবারটিকে আনার চেষ্টা চলছে।